কাঁঠাল গাছের পরিচর্যা
কাঁঠাল গাছের ফলন নির্ভর করে বাগানের পরিচর্যার ওপর আর পরিচর্যার প্রথমেই আসে সুষম সার ব্যবস্থা। গাছ থেকে কাঁঠাল সংগ্রহ করার পর বাগানে সার ব্যবস্থাপনার কাজটি করতে হবে। এর পর হলো সেচ ব্যবস্থা। মাটিতে রসের ঘাটতি হলে প্রয়োজন অনুসারে বাগানে সেচ দিতে হবে। পরে বাগানের রোগবালাই ও পোকা-মাকড় দমন ব্যবস্থাপনা সঠিক ও সময় মতো না নিলে কাঁঠালের ফলন কখনও কখনও শূন্যে নেমে আসতে পারে। নিয়মিত কিছু পরিচর্যার মাধ্যমে এর সংখ্যা বৃদ্ধি করা যায় এবং আকার-আকৃতি উন্নত করা যায়। কাঁঠালের ভালো ফলন পেতে হলে নিয়ম অনুসারে নিম্নলিখিতভাবে বাগানের পরিচর্যা করতে হবে। কাঁঠাল গাছের ফলন সাধারণত এর কা- এবং শাখা-প্রশাখায় উৎপন্ন ফুটস্টকে ধরে কর্তিত বোঁটা বা ডালের গিঁটের মতো উঁচু জায়গা থেকে ফুটস্টক বের হয়। ফুটস্টক যত বেশি হবে কাঁঠালও তত বেশি হবে। এ জন্য সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে কা-ে ঝুলে থাকা কাঁঠালের বোঁটার অবশিষ্ট ছোট ডালপালা ছেঁটে দিতে হবে। কাঁঠাল গাছের জন্য সেচ খুবই গুরত্বপূর্ণ, তাই নভেম্বর থেকে এপ্রিলের ১৫-২০ দিন পর্যন্ত সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। গাছের গোড়ার তিন থেকে চার ফুট জায়গা বাদ দিয়ে চারদিকে থালা আকৃর্তি করে সেখানে সেচ দিতে হবে। কাঁঠাল গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না, তাই গাছের গোড়ায় যাতে পানি না দাঁড়ায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কাঁঠাল গাছে বছরে দুইবার সার প্রয়োগ করা উচিত। প্রথম কিস্তি মে মাসে। দ্বিতীয় কিস্তি অক্টোবর-নভেম্বর মাসে। একটি বয়স্ক কাঁঠাল গাছের গোড়ার কমপক্ষে চার ফুট দূরে গোলাকার পদ্ধতিতে কাঁঠাল গাছের সার প্রয়োগ করতে হবে। একটি বয়স্ক কাঁঠাল গাছের ৬০ কেজি গোবর, ১ কেজি ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১ কেজি ৬০০ গ্রাম টিসপি, ১ কেজি ৩০০ গ্রাম এমপি, ৩০০ গ্রাম জিপসাম প্রয়োগ করতে হবে।
রোগবালাই ব্যবস্থাপনার জন্য অতিরিক্ত ডালপালা ছাঁটাই করে কাঁঠাল গাছের সঠিক আকার দিতে হবে। প্রুনিং এবং ট্রেনিং করতে হবে। প্রুনিং এবং ট্রেনিংয়ে ধারাল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে। ভাঙা ডালপালা করাত দিয়ে সুন্দর করে কেটে প্রুনিং পেস্ট লাগিয়ে দিতে হবে। কাঁঠালের একটি গুরত্বপূর্ণ রোগ হলো ফল পচা রোগ, এতে ফলের গায়ে বাদামি রঙের দাগের মতো হয়ে ফলের পচন হয় এবং ঝরে পড়ে। এ রোগ দমনের জন্য পুরুষ ও স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরি বের হওয়ার সময় থেকে ১০ দিন পর পর দুই-তিনবার ম্যাকুপ্র্যাক্স বা কুপ্রাভিট অথবা একই গ্রুপের ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। কাঁঠালে কা- ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণে গাছের গুঁড়িতে গর্ত হয়ে থাকে। এর প্রতিকারের জন্য সুচাল লোহার শলাকা গর্তের ভেতর ঢুকিয়ে খুঁচিয়ে পোকা মারতে হবে। গর্তের মুখ পরিষ্কার করে এর মধ্যে কেরোসিন বা পেট্রল দিয়ে গর্তের মুখে কাদামাটি দিয়ে বন্ধ করতে হবে। ফুল আসার সময় সুমিথিয়ন বা ডায়াজিনন ৬০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে দুই মিলি লিটার হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর দুই তিনবার স্প্রে করতে হবে। কাঁঠাল ব্যাগিং করেও ফল ছিদ্রকারী পোকাসহ অন্যান্য পোকার আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করা যায়। এ জন্য কাঁঠালের পুষ্পমঞ্জরি ফলে পরিণত হওয়ার পর থেকে প্রায় ১ মাস বয়সের কাঁঠাল ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে বোঁটার কাছে ব্যাগের খোলা মুখ দড়ি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে এবং তা ফল সংগ্রহ পর্যন্ত রাখতে হবে। এ জন্য ট্রান্সপারেন্ট পলিথিন ব্যাগ ও কালো পলিথিন ব্যাগ এবং পোলট্রি ফিডের ব্যাগ ব্যবহার করা যায়। কালো পলিথিনের ভেতর দিয়ে আলো প্রবেশ করতে না পারার কারণে এতে কাঁঠালের রঙ আর্কষণীয় হলুদ হয়ে থাকে। ব্যাগিংয়ের আগে ফলকে নীরোগ এবং পোকার আক্রমণ মুক্ত রাখার জন্য ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে ।
কাঁঠাল পুষ্টি মূল্য: আমিষ ও ভিটামিন এ সমৃদ্ধ। ভেষজ গুণ: কাঁঠালের শাঁস ও বীজকে চীন দেশে বলবর্ধক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কাঁঠালের শিকড়ের রস জ্বর ও পাতলা পায়খানা নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। উপযুক্ত জমি ও মাটি:পানি দাঁড়ায় না এমন উঁচু ও মাঝারি সুনিষ্কাষিত উর্বর জমি কাঁঠালের জন্য উপযোগি।জাত পরিচিতি: কাঁঠালের কোনো অনুমোদিত জাত নেই। তবে তিন ধরণের কাঁঠাল চাষ হয়-খাজা, আদারসা ও গালা। চারা রোপণ: ষড়ভূজী পদ্ধতিতে সুস’, সবল ও রোগমুক্ত চারা বা কলম মধ্য জ্যৈষ্ঠ থেকে মধ্য শ্রাবণ মাসে রোপণ করতে হয়। গাছ ও লাইনের দূরত্ব ১২ মিটার করে রাখা দরকার। সার ব্যবস্থাপনা: রোপণের সময় প্রতি গর্তে গোবর ৩৫ কেজি, টিএসপি সার ২১০ গ্রাম, এমওপি সার ২১০ গ্রাম সার প্রয়োগ করতে হয়। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রতি গাছের জন্র সারের পরিমান বৃদ্ধি করা দরকার। সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা: চারা/ কলমের তাড়াতাড়ি বাড়বাড়তি হওয়ার জন্য পরিমিত ও সময় মতো সেচ প্রদান করা দরকার। পোকা মাকড় ব্যবস্থাপনা: কাঁঠাল পচা রোগ: এক ধরণের ছত্রাকের আক্রমণে এ রোগ হয। এ রোগের আক্রমণে কচ ফলের গায়ে বাদমি রঙের দাগের সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত আক্রান্ত ফল গাছ থেকে ঝড়ে পড়ে। প্রতিকার: গাছের নিচে ঝড়ে পড়া পাতা ও ফল পুড়ে ফেলতে হয়। ফলিকুর ছত্রাকনাশক ০.০৫% হারে পানিতে মিশিয়ে গাছে ফুল আসার পর থেকে ১৫ দিন পর পর ৩ বার সেপ্র করা দরকার। মুচিঝরা রোগ: ছত্রাকের আক্রমণের কারনে ছোট অবস্থাতেই কালো হয়ে ঝড়ে পড়ে। প্রতিকার: ডাইথেন এম ৪৫ অথবা রিডোমিল এম জেড ৭৫, প্রতিলিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম করে মিশিয়ে সেপ্র করতে হবে।






